Feature Label 3

2
assador ali

সিলেটে ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক যাঁরা ছিলেন তাঁদের প্রায় অনেকেই আজ আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। আমরা পরম শ্রদ্ধায় তাঁদের স্মরণ করছি। সম্প্রতি আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম দু’জন ভাষা সৈনিক এডভোকেট মনির উদ্দিন স্যার এবং প্রফেসর আব্দুল আজিজ স্যারের। আজকের সাক্ষাৎকারে থাকছে সিলেটে ভাষা আন্দোলনের ঘটনা প্রবাহ এবং দু’জন ভাষা সৈনিকের নিজস্ব কিছু গল্প।

ভাষা সৈনিক এডভোকেট মনির উদ্দিন ১৯২৫ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ছাত্র জীবনে মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন কিন্তু পরে বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ, গণতন্ত্রী দল, ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি কিছুদিন পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) ছিলেন। এরপর দীর্ঘদিন সিলেট সরকারি ল’কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেনদীর্ঘদিন যাবত কানের সমস্যার কারণে কারো কথা শুনতে পারেন না। কাগজে লিখে লিখে উনার সাথে কথা বলতে হয়। স্ত্রী, এক মেয়ে এবং এক ছেলে নিয়ে তাঁর সংসার। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলে প্রবাসী। বাড়িতে দেখাশোনার জন্য কাজের লোক রয়েছে। বর্তমানে উনার মেয়েই সব খোঁজ খবর রাখেন। 


জনাব মনির উদ্দিন ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সম্মাননা হিসেবে রাগীব-রাবেয়া ফাউন্ডেশনের ‘একুশে সম্মাননা-২০১৩’, জেলা প্রশাসন সিলেট, সিলেট বার এসোসিয়েশন, গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, সিলেট পুলিশ সুপার থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। এছাড়া সিলেট জেলা পুলিশ থেকে পেয়েছেন ‘অমর একুশে বই মেলা-২০১১’ স্মারক সম্মাননা।

ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ের কথা জানতে ‘অবসর’ ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে স্যারের সাথে আমরা দেখা করি। দোতলা ভাড়া বাসার নিচ তলায় এক সময়ের ভাষা সৈনিক মনির উদ্দিন বসবাস করছেন। বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেন না। কথা জড়িয়ে যায়। মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। এরপরেও তিনি আমাদের অনেকটা সময় ধরে তাঁর জীবনের গল্প বলেছেন। তাঁর ভাষায়- আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। ওই সময় যারা ভাষা আন্দোলনের চেষ্টা করেছিল তাদের উপর মুসলিম লীগ থেকে হামলা হয়
১৯৫২ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের সেক্রেটারি ছিলেন এম এ বারী, ভাষা আন্দোলনের সামনের কাতারের নেতা ছিলেন উনি। ১৯৪৮ এর শেষ দিকে আমি সিলেটে আসি সিলেটে ৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সেক্রেটারি ছিলাম। আমি প্রত্যক্ষভাবে সভা সমিতি করেছি
স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তখন ছাত্র রাজনৈতিক দল বলতে আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং যুবলীগের কথা শোনা যায়। ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই দুই দলের ভূমিকা কি ছিল?
মনির উদ্দিনঃ রাজনীতির সাথে জড়িত যুবকই এখানে আওয়ামীলীগের সাথে জড়িত ছিলেন১৯৫১ সালে ঢাকায় যুবলীগ প্রতিষ্ঠিত হয় সরকার এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়তখন ঢাকায় যুবলীগের সভাপতি হওয়ার জন্য কাউকে পাওয়া যায়নিআমি এসে সিলেট থেকে মাহমুদ আলীকে নিয়ে যাই এবং তিনি সভাপতিত্ব করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন আর সেক্রেটারি হয় অলি আহাদ আর কমরেড তোহা সাহেব ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্টআমি ১৯৫১ সালে সিলেটের যুবলীগের জেলা সেক্রেটারি ছিলাম। ৫৩ সালে আমি পূর্ব পাকিস্তান গণতন্ত্রী দলের জেলা কমিটির সেক্রেটারি ছিলাম। এবং ৫৭ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সেক্রেটারি ছিলামভাষা আন্দোলনের সময় সিলেটে আওয়ামীলীগ খুব একটা শক্তিশালী ছিল না মূল কর্মীরা সবাই ছিল পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের লোক। মূলত পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের নেতৃত্বে এখানে আন্দোলন হয়। আন্দোলনের একটা অন্যতম দিক ছিল মুসলিম মেয়েরা এর আগে কখনও কোন সমাবেশে বের হয় নি কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সময় সিলেটের মুসলমান ঘরের মেয়েরাও ঘর থেকে বের হয়েছেনতারাও ভাষা দাবীতে রাস্তায় নেমেছেন। এখানে অনেক বড় সমাবেশ হয়েছিলএছাড়া আন্দোলনের সময় যেসব এম পি সিলেটে ছিলেন তার মধ্যে জনাব তৈমুর রাজা, আব্দুর রব তাদের বাসা ঘেরাও করি যেন তারা এটা সমর্থন করেফেব্রুয়ারির পরে সিলেটে নতুন ডিসি আসেনতাকে ঢাকা থেকে বদলি করা হয় কারণ তিনি ১৪৪ ধারা জারির পক্ষে ছিলেন নাআমাদের সভাতে স্থায়ী ভাবে মাইক রাখা ছিলবাইরে থেকে স্কুল কলেজের যারাই এসেছেন মাইক ব্যবহার করেছেন হরতাল করেছিপুলিশ কোন বাঁধা দেয়নি। মুসলিমলীগও তখন বাঁধা দেয়ার সাহস করেনি
তখন পত্রিকা ছাড়া যোগাযোগের কোন মাধ্যম ছিল না। সেদিন শুক্রবার ছিলপত্রিকা থেকে যখন ঢাকার খবর জানলাম তখন সাথে সাথেই আমরা মিছিল বের করি। সবাই এসে এতে যোগ দেয়প্রথম দিনের সভায় সভাপতি ছিলেন আব্দুল্লাহ সাহেব দ্বিতীয় দিন আমি ছিলাম সভাপতি। গ্রামে গঞ্জেও তখন মানুষকে সঙ্গবদ্ধ করা হয়
আব্দুল আজিজ স্যার ব্যক্তিগত জীবনে এক ছেলে আর এক মেয়ের জনক। স্ত্রী রওশন আজিজের অনুপ্রেরণায় লেখালেখির কাজ চালিয়ে নিয়েছেন। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তাঁর লেখা ২২টি বই আছে। সম্প্রতি ২০১৪ বই মেলায় চৈতন্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সিলেট’ নামক তথ্যবহুল গ্রন্থটি১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মার্চ বালাগঞ্জ থানার খাগদিওর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেনঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বি. এ. অনার্স সহ এম. এ. পাশ করেন এবং ইংল্যান্ডের লোস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এ. ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি সিলেট এম সি কলেজের অধ্যক্ষ, রাজশাহী ও কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, খণ্ডকালীন শিক্ষক ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে প্রায় এক দশককাল চাকরি করেছেন। এরপর সিলেটের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক, ডিন, কোষাধ্যক্ষ ও উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
একদিন দুপুরে স্যারের রুমে যাই আমরা দুইজন। অমায়িক ব্যবহার এবং কথার যাদুতে স্যারের সাথে আমাদের কেটে যায় অনেকটা সময়। স্যারের কাছে প্রশ্ন করেছিলাম ভাষা আন্দোলনের শুরুতে ৪৭ এবং ৪৮ সালের ভূমিকা কি ছিল?
আব্দুল আজিজঃ আনুষ্ঠানিক ভাবে ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ৪৭’র ডিসেম্বর থেকে। জুন-জুলাই এর দিকে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য জিয়া উদ্দিন আহমদ হায়দ্রাবাদের এক জনসভায় বললেন পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হওয়া উচিত উর্দু। তখনও কিন্তু পাকিস্তানের জন্ম হয় নাই। এরপরে এক ধরণের প্রতিক্রিয়া হয় এবং জুলাইয়ের দিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একটা প্রবন্ধে এর বিরোধিতা করেন। এরপর বিভিন্ন লেখক বলতে গেলে অনেকেই পত্রিকায় লেখালেখি করেন এবং তাঁরা সকলেই বাংলার স্বপক্ষে কথা বলেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের জন্ম হল এবং সে সময়ই সিলেটের পত্রিকা আল ইসলাহ সম্পাদকীয় মন্তব্য করল বাংলা রাষ্ট্র ভাষার স্বপক্ষে। ৪৭ এ তমদ্দুন মজলিশ গঠিত হল। তারা একটা বুকলেট প্রকাশ করল যেখানে অনেক পণ্ডিত বাংলা ভাষার পক্ষে লিখেছিলেন। বলতে গেলে তখন থেকেই একটা আলোচনার সূত্রপাত হল বাংলার স্বপক্ষে। অক্টোবর নভেম্বরের দিকে দেখা যায় পাকিস্তানের টাকা, মানি অর্ডার ফর্ম, ট্রেনের টিকেট সব কিছুতে ইংরেজির সাথে উর্দু ব্যবহার করা হল, বাংলা ব্যবহার হল না। এটা বাঙ্গালিদের ক্ষেপিয়ে তুললডিসেম্বরে করাচিতে শিক্ষা সম্মেলন হল। সেই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হল যে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হওয়া উচিৎ উর্দু। সাথে সাথেই পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদ হয়। সিলেটে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে অনেকগুলো সভা হয়। সেই সময় প্রবীণ শিক্ষাবিদ মসলিম চৌধুরী একটা প্রবন্ধ লেখেন। আমাদের জানা মতে এই প্রবন্ধই ছিল পাকিস্তান আমলে লিখিত বাংলা ভাষার স্বপক্ষে প্রথম প্রবন্ধ। এরপর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আরও একটা সভা হয়। সেখানে সভাপতিত্ব করেন রম্যসাহিত্যিক মতিন উদ্দিন আহমদ। সেই সভায় আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হল সৈয়দ মুজতবা আলীকে। তিনি খুব চমৎকার একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। সভায় উপস্থিত মানুষদের ধারণা জন্মে যে এখানে উর্দু এবং বাংলা প্রশ্নে বিতর্ক হবে। সেখানে যথেষ্ট সংখ্যক উর্দুপন্থী যারা ছিলেন তারা হৈচৈ করলেন খুব। এবং বলতে গেলে সেই সভা বন্ধই করে দেয়া হলপরে মুজতবা আলী তাঁর
Has free for natural viagra birthday. Other Perfect. Characteristic cheap levitra to my cream cheap viagra used it toy. Grandson’s cialis online becuse – making people online pharmacy unmanageable long life. S order viagra allergic next comfortable buy levitra online it perfect its other generic pharmacy online less etc body reviewer’s generic viagra flaky hats! Softened generic online pharmacy bought paired is Mascara-…
প্রবন্ধ বিস্তারিত লিখে প্রকাশ করলেন আল ইসলাহ পত্রিকা এবং কলকাতার চতুরঙ্গ পত্রিকায়। এরপর সাহিত্য সংসদ আরও একটি সভা আয়োজন করে। সেখানে প্রবন্ধ পাঠ করেন দেওয়ান আজরফ। সেটিও খুব আলোচিত হয়। কিন্তু মূল আন্দোলন শুরু হল ৪৮ এ। ১৯৪৮’র পহেলা জানুয়ারি সিলেটে প্রথম একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হয় ‘নও বেলাল’ নামে। এর সম্পাদক ছিলেন দেওয়ান আজরফ। কিন্তু এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক ছিলেন মাহমুদ আলী। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হল তিনি বাংলাদেশের অস্তিত্ব মেনে নিতে পারেন নাই। তিনি পাকিস্তানেই থেকে যান। সেখানে মিনিস্টার উইদাউট পোর্টফোলিও হিসেবে যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন কাজ করেছেন।
পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন বসে করাচিতে। সেখানে আলোচনা হল পরিষদে আলাপ আলোচনা হবে কোন ভাষায়? সেখানে ইংরেজি আর উর্দুকে প্রাধান্য দেয়া হয়। কুমিল্লার নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। উনি প্রস্তাব আনলেন যে, বাংলাকে উর্দু এবং ইংরেজির পাশাপাশি গণপরিষদে আলাপ আলোচনার অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হোক। এরপর একটা বিতর্ক হয় সেখানে পূর্ব বাংলার প্রায় সকলেই উর্দুর পক্ষে কথা বললেন। লিয়াকত আলী তখন ধীরেন্দ্রনাথকে প্রায় নাজেহাল করে ফেললেন। বললেন, এটা তাদের হিন্দুদের ষড়যন্ত্র। এই সংবাদ যখন ঢাকায় পৌঁছুল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলএরপর তারা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করলেন এবং মার্চ মাসের ১১ তারিখে সারাদেশে ধর্মঘট আহ্বান করলেন।
অবসরঃ তমদ্দুন মজলিশ সম্পর্কে বলুন।
আব্দুল আজিজঃ ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র-শিক্ষক মিলে তমদ্দুন মজলিশ নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠন ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। ভাষা আন্দোলনে সিলেট অঞ্চলের মহিলাদের অবদান খুব বেশি ছিল। সে সময় তমদ্দুন মজলিশের সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম সিলেটের মহিলাদের অভিনন্দন জানিয়ে মুসলিম মহিলা লীগের সভানেত্রী জোবেদা রহিমকে একটি চিঠি লেখেন। এরপর ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সভায় গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। সিলেটে ভাষা সংগ্রামের অগ্রসৈনিক হবিবুর রহমানের মতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির প্রস্তাবিত কর্মসূচি পালনের আয়োজন করতে সিলেটে আসেন তমদ্দুন মজলিশের সদস্য শাহেদ আলী। তিনি হবিবুর রহমানকে দায়িত্ব দিয়ে গেলে হবিবুর রহমান এই বিষয় নিয়ে জোবেদা রহিমের সাথে আলোচনা করেন। পরে মহিলা মুসলিম লীগের সভানেত্রী জোবেদা রহিমকে সভানেত্রী এবং দেওয়ান অহিদুল রেজাকে সম্পাদক করে তমদ্দুন মজলিশের সিলেট শাখা গঠিত হয়। কমিটির পক্ষে ৮ মার্চ সিলেটে গোবিন্দচরণ পার্কে (বর্তমান হাসান মার্কেটের সামনে) জোবেদা রহিমের সভাপতিত্বে এক সভা আহ্ববান করা হয় কিন্তু জোবেদা রহিম উপস্থিত না হতে পারায় সভা সভাপতিত্ব করার জন্য মাহমুদ আলীর নাম প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু সভার শুরুতেই উর্দুপন্থীরা সভা ভণ্ডুল করার চেষ্টা চালায়। মুসলিম লীগের ক্যাডার ধলা বারী টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে আবোল তাবোল বক্তৃতা শুরু করে দেয়। তমদ্দুন মজলিশের সদস্যগণ উর্দুপন্থীদের ছোঁড়া ইট পাটকেলের আঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত হন। সন্ত্রাসীরা চেয়ার টেবিলে লাথি মারতে থাকে। তারা ছাত্রকর্মী মকসুদ আহমেদকে অমানুষিক প্রহার করে। মকসুদ আহমেদের বাবা ছিলেন সিলেটের এডিশনাল এসপি। তিনি মকসুদের আহত হবার সংবাদে ক্ষিপ্ত হন যে কারণে মকসুদকে বাড়িতে নেয়া সম্ভব হয়নি। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন আরেক ভাষা সৈনিক মনির উদ্দিন।
পরে সভায় জোবেদা রহিমের অনুপস্থিতি সম্পর্কে জানা যায়, তিনি বাধ্য হয়েছিলেন সভায় অনুপস্থিত থাকতে। উনার স্বামী ছিলেন সরকারি উকিল। তিনি কোর্টে খবর পান যে আজকে সভায় গোলযোগ হতে পারে। তাই তিনি তার স্ত্রীকে সভায় যেতে নিষেধ করেন এবং এও বলেন যে তিনি যদি সভায় উপস্থিত হন তাহলে উকিল সাহেব আত্মহত্যা করবেন।
এর আগে বলে নেই, ৪৮’র জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের যোগাযোগ মন্ত্রী আব্দুর রব নিশ্তার সিলেটে এলে সিলেটের মহিলা নেত্রীবৃন্দ নিশ্তার সাহেবকে বাংলার স্বপক্ষে একটি স্মারকলিপি দেন। সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুহিত সাহেবের মা সাহেরা খাতুন এবং আরও কয়েকজন মহিলা। সেইদিনই নিশ্তার সাহেবের কাছে মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষ থেকেও একটা স্মারকলিপি দেয়া হয়। এইখানে নেতৃত্ব দেন আবদুস সামাদ আজাদ। পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমউদ্দিন। তার কাছেও সিলেটের মহিলারা একটি স্মারকলিপি দেন। সাপ্তাহিক পাকিস্তান হেরাল্ড বা আসাম হেরাল্ড নামের ইংরেজি পত্রিকা এবং সাপ্তাহিক যুগভেরী নামের বাংলা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন রজিউর রহমান। এই স্মারকলিপির পক্ষে বিপক্ষে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়। আর এই দুই পত্রিকায় সিলেটের মহিলাদেরকে নিয়ে খুব বাজে ভাবে মন্তব্য করা হয়। এর বিরুদ্ধে আবদুস সামাদ আজাদসহ অনেকেই প্রতিবাদ জানান।
সভায় হামলার প্রতিবাদে ১০ মার্চ একই স্থানে জেলা মহিলা মুসলিম লীগ আরেকটি সভা আহ্বান করে। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে তৎকালীন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এম. ইসলাম চৌধুরী গণ্ডগোলের আশংকায় সিলেট জেলায় উর্দু বাংলার প্রশ্নে সকল প্রকার সভা সমাবেশ দুই মাসের জন্য নিষিদ্ধ করেন। এ ছাড়া এ ঘটনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তমদ্দুন মজলিশ সিলেট শাখার সম্পাদক দেওয়ান অহিদুর রেজা এবং সিলেট জেলা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সামাদ সিলেটের রাষ্ট্র ভাষার বাংলার পক্ষের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘নও বেলাল’ এ ১১ মার্চে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন।
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১১ মার্চ ঢাকা ও দেশের অন্যান্য স্থানে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। পিকেটিং চলাকালে কোন কোন স্থানে পুলিশ লাঠিচার্জ করেছিল। গ্রেফতার করা হয় শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান সহ অনেক কর্মীকে। এরপর ১৯ মার্চ ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা আসেন এবং ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক সংবর্ধনা সভায় ঘোষণা করেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা না’।
২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ সমাবর্তনে তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন। তখন কিছু ছাত্র না না বলে এর প্রতিবাদ জানান। এই ঘটনার পর কিছু আন্দোলন প্রতিবাদ হয়েছিল কিন্তু এরপর ভাষা আন্দোলন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে।
অবসরঃ তখন কি স্যার আপনি সিলেটে ছিলেন?
আব্দুল আজিজঃ না, আমি তখন মফস্বলে ছিলাম। তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলাম। আমার বাড়ি ছিল সিলেট শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে তাজপুর নামক স্থানে। আর ৪৮ সালে সম্ভবত ক্লাস সেভেন এ পড়তাম।
অবসরঃ আন্দোলনে কি আপনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন?
আব্দুল আজিজঃ সরাসরি বলতে কি, আমাদের সময় আমার স্কুলে (তাজপুর মঙ্গলচণ্ডী হাই স্কুল) ক্লাস নাইনে যারা ক্যাপ্টেন হত তারা মোটামুটি পুরো স্কুলেরই ক্যাপ্টেন থাকতআমার একটা সুবিধা ছিল যে আমি বিভিন্ন পত্র পত্রিকা পড়তাম। আমি একটু রাজনীতি সচেতন ছিলাম এবং যে কোন বিষয়ে সবাই আমার কথা শুনত৫২ সালে যখন আন্দোলন শুরু হল, আমরা তখন ২১ ফেব্রুয়ারিতে স্কুলেই ধর্মঘট পালন করার চেষ্টা করি। ঢাকার গোলাগুলির খবর আমরা পাই পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি। এরপর সিদ্ধান্ত নেই আমাদের স্কুল এবং আশেপাশের স্কুলে ধর্মঘট পালন করব। স্কুলের পাশে একটা মাদ্রাসা ছিল। সেখানকার ছাত্ররাও প্রগতিশীল ছিল। ফলে তারাও আন্দোলনে শরীক হয়। কিন্তু সে সময় গ্রাম অঞ্চলে সমাবেশ করা খুব কঠিন ছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ২৫ ফেব্রুয়ারি সোমবারে বাজার যখন বসবে তখন আমরা বাজারের পাশে একটা জনসভা করব। আমাদের স্কুলের পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন আব্দুল বারীতাঁর সহায়তায় আমরা বাজারের পাশে সমাবেশ করি। সেখানে আমি বক্তৃতা করি। আমি আবার নও বেলালের স্থানীয় সংবাদদাতা ছিলাম। যে কারণে নও বেলাল আমি ফ্রিই পেতাম। ২৩ তারিখে নও বেলাল আন্দোলনের সংবাদ ছাপে। সেই সংবাদ আমি সমাবেশে সকলকে পড়ে শোনাই। তখন কিন্তু মাইকের ব্যবহার ছিল না। টিনের চোঙ্গের সাহায্যে কথা বলতে হত। যাই হোক, এইসব সংবাদ শুনে স্থানীয় মানুষ খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তখনকার দিনে ছাত্রদের প্রতি মানুষের একটা স্নেহ পরায়ণ দৃষ্টি ছিল। ছাত্রদের প্রতি মানুষের সাংঘাতিক মমতা ছিল। এবং ছাত্রদের দ্বারা কারও কোন ক্ষতি হতে পারে এই রকম চিন্তা কারো ছিল না। পরদিন সংবাদ গেল বালাগঞ্জ থানায়। তাজপুরে একটা পুলিশ ক্যাম্প ছিল। সেটাকে বলা হত গারদতো বালাগঞ্জ থানা থেকে সেই গারদে সংবাদ পাঠানো হল আমাকে গ্রেফতার করার জন্য। আমার তো তখন টেস্ট পরীক্ষা শেষ। কিন্তু আমি পরদিন স্কুলে যাচ্ছিলাম সংগঠনের কাজে। পথিমধ্যে সংবাদ পেলাম যে আমাকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ খুঁজছে। আমাকে বলা হল আমি যেন পালিয়ে যাই। এরপর গা ঢাকা দিলাম। আর এর সাথে সাথে সেখানে আন্দোলন সংগঠিত করার মত কেউ রইল না। যারা ছিলেন তাদের খুব একটা প্রভাব ছিল না। আর টেস্ট পরীক্ষার পর সবাই বাড়িতে চলে গিয়েছিল। যে কারণে সেখানে আর কেউ ছিল না।
ছাত্র ইউনিয়নের কিন্তু জন্ম হয়েছিল সিলেটে ১৯৫১ সালে আর কমরেড আছদ্দর আলী (পরবর্তীতে আসাদ্দর আলী) ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। তিনি ভাষা আন্দোলন সহ সকল প্রগতিশীল আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৬ নভেম্বর ১৯৫১ সালে কনফারেন্সের মাধ্যমে ছাত্র ইউনিয়নের যাত্রা শুরু হবে যেদিন সেদিন সিলেট সহ গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার সহ কিছু থানায় ১৪৪ ধারা জারী করে দেয়া হয়। আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, এই সম্মেলনের উদ্যোক্তা যারা ছিলেন যেমন আছদ্দর আলী এবং তারা মিয়া, তাদের দুজনের উপর ব্যক্তিগত ১৪৪ ধারা জারী করা হয়। অর্থাৎ তারা কোন ছাত্রের সাথে কথা বলতে পারবেন না। কথা বললে ১৪৪ ধারা অমান্য করা হবে এবং তাদের গ্রেফতার করা হবে। তাই তখন সম্মেলন স্তিমিত হয়ে যায়। উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নিলেন তারা সিলেটের বাইরে চলে যাবেন। আমরা যারা বাইরে থেকে এলাম তাদেরকে রেল স্টেশনের রোডের আশেপাশের ছোট ছোট বাড়িতে আমাদের এক একজন করে গ্রুপ করে আলাদা করে রাখা হল। এরপর দুপুরে খাওয়া দাওয়া করিয়ে উনারা আমাদের ট্রেনে তুলে দিলেন আমরা তখনও জানি না যে কি হচ্ছে। ট্রেনে তখন কিছু জনপ্রিয় গণসংগীত শিল্পী ছিলেন। তারা গান শুরু করলেন। প্রায় ১৮ মেইল দূরে ফেঞ্চুগঞ্জে আমাদের ট্রেন থেকে নামানো হল। এরপর সেখানে একটা বড় মাঠে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। মাঠের পাশের বাড়ি থেকে একটা টেবিল আর একটা চেয়ার নিয়ে আসা হল আর আমাদের বল হল আমরা সম্মেলন এখানেই করব। এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন আবুল হাসেম কিন্তু তিনি এবং সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক খায়রুল কবির যখন শুনলেন সিলেটে ১৪৪ ধারা জারির খবর তখন তারা আর সিলেটে এলেন না। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সম্পাদক অলি আহাদ এবং যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক এবং বরিশাল যুবলীগের সভাপতি এমাদুল্লাহ সাহেব তখন সিলেটে ছিলেন তাদের সাংগঠনিক কাজে। এমাদুল্লাহ সাহেবের স্ত্রীর নাম ছিল নুরজাহান বোসনি ‘আগুন মুখর মেয়ে’ নামের একখানা বই লিখেছিলেন যা খুবই সুখপাঠ্য। এমাদুল্লাহ সাহেবের মৃত্যুর পর তিনি রাজনৈতিক নেতা স্বদেশরঞ্জন বোসকে বিয়ে করেন। স্বদেশরঞ্জন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথ যুক্ত ছিলেন। তিনি খুবই মেধাবী ছিলেন। ইকোনমিক্সে এম. এ. পাশ করে করাচিতে তৎকালীন ‘পাকিস্তান ইন্সটিটিউট অব ডেভলপমেন্ট ইকোনোমিক্স’- এ চাকরি করতেন।
তো আবুল হাসেম এবং খায়রুল কবির যখন সিলেটে এলেন না তখন এমাদুল্লাহ সাহেবকে করা হল সভাপতি আর সম্মেলন উদ্বোধন করলেন অলি আহাদসম্মেলন চলাকালীন ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ওসি সাহেব ১৪৪ ধারা জারী করার পরোয়ানা নিয়ে হাজির হলেন। এমাদুল্লাহ সাহেব ওসি সাহেবকে অপেক্ষা করতে বলে তিনি তাঁর বক্তৃতা শেষ করলেন। তিনি কিন্তু তুখোড় বক্তা ছিলেন। দেখতেও ছিলেন চমৎকার। পোশাক পরিচ্ছদেও একটা সৌন্দর্য্য ছিল উনার। তিনি বক্তৃতা শেষ করে ওসি সাহেবের পরোয়ানায় সই করে বললেন যে, ঠিক আছে আমরা সভা বন্ধ করে দিলাম এবং আপনার ১৪৪ ধারা মেনে নিলাম। এরপর কিন্তু অন্য রকম একটা ঘটনা ঘটে। তখন আসরের নামাযের সময় হয়ে গিয়েছিল। মাঠেই নামাযের ব্যবস্থা করা হল। ইমাম সাহেব ছিলেন মদন মোহন কলেজের নাইটের ছাত্র (তখন কলেজে নাইট শিফট ছিল) আদতে মাদ্রাসার মৌলভী এবং দিনের বেলা তিনি কিশোরী মোহন স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ইমাম সাহেবকে বলা হল, আপনি যখন মোনাজাত করাবেন তখন আমাদের সংগঠনের এই প্রস্তাবগুলো পাঠ করবেন। ইমাম সাহেব ঠিক তাই করলেন। নামাজ শেষে গণ সংগীতের অনুষ্ঠান শুরু হল আর কেউ যেন বুঝতে না পারে এমন করে তার পাশেই ছোট মিটিং শুরু হল। সে মিটিং এ মদন মোহন কলেজের বিএ ক্লাসের ছাত্র আব্দুল হাইকে সভাপতি এবং এমসি কলেজ ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের ছাত্র খন্দকার রুহুল কুদ্দুসকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হল। এই কমিটিই পরবর্তীকালে ঢাকায় যখন প্রাদেশিক ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হল তখন তাদের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। সিলেটে ছাত্র ইউনিয়নের মটো ছিল শিক্ষা, ঐক্য ও প্রগ্রতি কিন্তু ঢাকায় শিক্ষা ও ঐক্যর পাশাপাশি প্রগ্রতির স্থলে যুক্ত হয় শান্তি কথাটি। ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থাকার কারণে নেতাদের সাথে আমাদের ভাল সম্পর্ক ছিল। আমি ছিলাম ছাত্র ইউনিয়নের কলেজ ইউনিটের সভাপতি।
অবসরঃ স্যার সিলেটের আন্দোলন নিয়ে কিছু কথা বলেন। ২১ তারিখে সিলেটে কি হয়েছিল।
আব্দুল আজিজঃ ২১ তারিখে সিলেটে তেমন কিছু হয়নি। ২১ তারিখ রাতেই ঢাকার আন্দোলনের খবর চলে আসে সিলেটে। সিলেট মার্চেন্টাইজ এসোসিয়েশন রাতে এই সংবাদ শুনে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে পরের দিন তারা সিলেটে হরতাল করবে। হরতাল হল। ঢাকার যে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ছিল সেটা সিলেটে ছিল রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ নামে। তারা ২২ তারিখ সকাল ১০টার দিকে মিটিং করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে পর দিন থেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করবেনএই ২২ তারিখ বিকেলে গোবিন্দচরণ পার্কে সমাবেশ হবে এবং সেখানে সভাপতিত্ব করবেন খেলাফত আন্দোলনের নেতা উকিল আব্দুল্লাহ। বিকেলে বিশাল জনসভা হয় এবং এখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে সিলেটের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি দেওয়ান তৈমুর রাজাকে অনুরোধ করা হবে তিনি যেন পদত্যাগ করেন। ঢাকায় গুলি বর্ষণের ঘটনায় সিলেটের যারা মুসলিম লীগের নেতাকর্মী ছিলেন এবং যারা প্রগতিশীল ছিলেন, বাংলা ভাষার পক্ষে ছিলেন, তারা প্রত্যেকে সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। মুসলিম লীগে দুই দল ছিল। একদল ঘোর পাকিস্তান প্রেমী আর অন্যরা ছিলেন প্রগতিশীল যারা পদত্যাগ করেছিলেন। ২৩ তারিখে সিলেটে বিশাল একটা মিছিল বের হয়। সেই মিছিলে সিলেট মহিলা কলেজের ছাত্রীরাও অংশগ্রহণ করেন। ৪৬ সালের পর সিলেটের কোন সভা মিছিলে মহিলারা কখনো প্রকাশ্যে যোগদান করে নাই। মিছিল শেষ হয় গোবিন্দচরণ পার্কে এবং সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মেনে নিতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীনের বিচার করতে হবে। এভাবেই আন্দোলন চলছিল। প্রতিদিন ১-২টা করে মিছিল হত। মিছিল শেষে গোবিন্দচরণ পার্কে সবাই মিলিত হত।
গোলাপগঞ্জে ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে এক সপ্তাহ পূর্ণ ধর্মঘট হয়। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, রণকেলী, ভাদেশ্বর, বালাগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও ফেঞ্চুগঞ্জ থানার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ধর্মঘট, সভা ও মিছিল করে। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ শহর, জামালগঞ্জ, পাগলা, গোয়ালিবাজার প্রভৃতি স্থানে হরতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। সুনামগঞ্জ মহকুমা মুসলিম লীগের সভাপতি মকবুল হোসেন আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে দল থেকে পদত্যাগ করেন। এছাড়া কুলাউড়া, পৃথ্বিমপাশা, শমসেরনগর, কমলগঞ্জ, ভানুগাছ, শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা, চুনারুঘাট, শায়েস্তাগঞ্জ, বাহুবল, নবীগঞ্জ ও আজমিরিগঞ্জে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বলে জানা যায়। আন্দোলনে জড়িত থাকার অপরাধে অনেককে গ্রেফতারও করা হয়।
অবসরঃ তখন মিছিল সমাবেশে প্রশাসন থেকে কি কোন সমস্যা করেনি স্যার?
আব্দুল আজিজঃ না, কোন সমস্যা করেনি। তখন প্রশাসন অনেকটা নীরব ছিল। এর কারণ ছিল ৪৮ সালে মানুষ যতটা রক্ষণশীল মনোভাবের ছিল সেটা ৫২ তে এসে অনেক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। আওয়ামী লীগের জন্ম হয়ে গেছে ১৯৪৯ সালে। আওয়ামী লীগের সিলেটের শাখা গঠিত হয়ে গেছে। আর যুবলীগও তখন প্রগতিশীল দল ছিল। তখন এর নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। অলি আহাদ ছিলেন সেক্রেটারি। ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়ে গেছে। অনেক সম্মেলন হয়েছে। এইসব কারণে মানুষের চিন্তা ধারায় এক ধরণের পরিবর্তন এসে গিয়েছিল। যে ধলা বারী ১৯৪৮ সালে জনসভা ভেঙ্গে দিয়ে স্টেজে উঠে এলোমেলো বক্তৃতা করল সেই ধলা বারী তখন বাংলার স্বপক্ষে অন্যতম নেতা৫ মার্চ একটা বিরাট জনসভা হয়সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে আন্দোলন আপাতত স্থগিত হয়ে যাবে। এই জনসভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সাহেবের বাবা জনাব উকিল আব্দুল হাফিজমুহিত সাহেবও সেই সভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। আসলে ঢাকার আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের অনেককেই গ্রেফতার করা হয়। কেউ কেউ গা ঢাকা দেন। এইসব মিলিয়ে আন্দোলন তখন স্তিমিত হয়ে পড়ে।
অবসরঃ ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি শহীদ অনেকের লাশ গুম করা হয়েছিল বলে আমরা জানি। এই শহীদের সংখ্যা কতজন হতে পারে বলে আপনার ধারণা?
আব্দুল আজিজঃ পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয় ৪ জন মারা গিয়েছিল। আহত হয়েছিল অনেক। তবে কেউ কেউ বলেন লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। আদতে এমন মনে হয় না। সালাম ঐদিন মারা যান নাই। আহত হয়ে পরে মারা গেছেন। হাসান আজিজুর রহমানের ২১ শে ফেব্রুয়ারির উপর একটা বই আছে। সেখানে এইসব তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া আমার একটা বই বের হচ্ছে ‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনে সিলেট’ শিরোনামে। আসলে ঢাকায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে ২১ তারিখে সমগ্র বাংলায় হরতাল পালন করা হবে। এই সংবাদে সরকার ২০ তারিখ থেকে এক মাসের জন্য সকল সভা সমাবেশের উপর ১৪৪ ধারা জারি করে। ২০ তারিখ বিকেলে সংগ্রাম পরিষদের মিটিং বসে। সেখানে তারা সবাই দুই ভাবে ভাগ হয়ে গেলেন। এক ভাগ বললেন, সামনে আমাদের ইলেকশন। আমরা যদি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করি তাহলে এই অজুহাতে সরকার ইলেকশন বন্ধ করে দিবে। এটা ছিল সাধারণত যারা রাজনীতিবিদ ছিলেন তাদের কথা। কিন্তু যারা বামপন্থী আর ছাত্র নেতা ছিলেন তারা এর বিপক্ষে ভোট দেন কিন্তু সংখ্যা লঘিষ্ঠতার কারণে তারা আর কিছু করতে পারলেন না। শহীদুল্লাহ হল এবং ফজলুল হক হলের মাঝখানে একটা পুকুর আছে। সেখানে রাতেই ১১ জন ছাত্র নেতা মিটিং এ বসেনএর মধ্যে ছিলেন গাজিউল হক, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, এম আর আকতার মুকুল প্রমুখ। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যেভাবেই হোক আগামীকাল আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করব। সে অনুযায়ী পরদিন সকাল ১০-১১টার দিকে মেডিকেল কলেজের দিকে বিভিন্ন খণ্ড খণ্ড মিছিল জমা হতে লাগলতখনই সিদ্ধান্ত নেয়া হল যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে। আব্দুস সামাদ আজাদ প্রস্তাব আনলেন যে ১০ জন করে আমরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ব। তাহলে অনেকগুলো মিছিল হবে এবং সেখানে বিশৃঙ্খলাও হবে না। মিছিল নিয়ে বের হতেই পুলিশ ছাত্র নেতাদের গ্রেফতার করে। লাঠিচার্জ করে এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। বর্তমানে যেখানে শহীদ মিনার আছে সেখানে ছিল মেডিকেল কলেজের হোস্টেল। এই হোস্টেলের সামনে থেকে পুলিশকে লক্ষ করে ছাত্ররা ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। আবার পুলিশও পাল্টা আক্রমণ করেএমতাবস্থায়, মোটামুটি বেলা ৩টার দিকে বাধ্য হয়ে পুলিশ গুলি বর্ষণ করে। এবং এই গুলিতেই বরকত মারা গেলেন। যারা আহত হলেন তাদেরকে ছাত্র ছাত্রীরা উদ্ধার করে নিয়ে গেল মেডিকেল কলেজে।
এই সংবাদ যখন রাজশাহীতে পৌঁছে তখন ২১ তারিখ রাতেই রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা শহীদ মিনার তৈরি করে ফেলেনসেই শহীদ মিনার পরদিন পুলিশ ভেঙ্গে দেয়। ২৩ তারিখে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারাও একটা শহীদ মিনার তৈরি করবে। তারা ইট বালি সিমেন্ট দিয়ে একটা শহীদ মিনার তৈরি করে ফেলেন। এটা উদ্বোধন করেন আবুল কালাম শামশুদ্দিন। সেদিন বিকেলেই এটা ভেঙ্গে ফেলা হয়।
অবসরঃ সিলেটে যে সব ভাষা সৈনিক ছিলেন তাঁদের নাম বলবেন কি স্যার?
আব্দুল আজিজঃ সিলেটের আন্দোলনের অগ্রসৈনিক ছিলেন হবিবুর রহমান। পরবর্তীতে তিনি পীর হাবিবুর রহমান নামে পরিচিত হন। জোবেদা রহিমের ছেলে আহমদ কবির চৌধুরী ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হয়েছিলেন। সিলেটের মেয়ে রওশন আরা বাচ্চুও একইভাবে লাঠিচার্জে আহত হন। কুলাউড়ার মেয়ে ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছালেহা বেগম শহীদদের স্মরণে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। এই অপরাধে জেলা প্রশাসক ডি কে পাওয়ার তাঁকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করেছিলেনএরপর তাঁর পক্ষে আর লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া শাহ এ. এম. এস. কিবরিয়া, এম. সাইফুর রহমান, একুশে টিভি এবং ডেইলি স্টার পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা আবু সাইদ মাহমুদ ছিলেন অন্যতম। সিলেটে ভাষা আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি হবিবুর রহমানকে আন্দোলনে জড়িত থাকার অপরাধে গ্রেফতার করা হয়। প্রথিতযশা রম্য-সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী, তাঁর দুই বোন সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন ও সৈয়দা লুৎফুন্নেছা খাতুন, সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুনের ছেলে আবু সাইদ মাহমুদ এবং মুজতবা আলীর স্ত্রী রাবেয়া আলী সকলেই ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া আমার নতুন গ্রন্থ ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সিলেট’ বইটিতে প্রায় ৬০ জন ভাষা সৈনিকের একটা লিস্ট এবং ছোট করে দেয়া পরিচিতি পাওয়া যাবে।
অবসরঃ বাংলা ভাষা বিশ্বের ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষের ৬ষ্ঠ অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও উক্ত ভাষার প্রসারে কিন্তু আমরা আন্তর্জাতিক রূপ দেখতে পারি না। দেশের বিভিন্ন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষাকে অনেক ক্ষেত্রে হিসেবের বাইরে রাখা হয়।
আব্দুল আজিজঃ যতদিন পাকিস্তান ছিল ততদিন তো তাদের কোন গরজ ছিল না। তারা বাংলা ভাষার উন্নয়নে কিছু করে নাই। বরং উর্দু হরফে বাংলা প্রচলনের একটা চেষ্টা করে হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ হবার পরেও এমন কিছু চোখে পড়েনি। আসলে অনেক কিছুই তো হয়নি। আমরা স্বাধীনতার পর ভেবেছিলাম এই হবে, সেই হবে। কিন্তু কিছু হয়নি। আমরা শুধু একটা পতাকাই পেয়েছি। যে কারণে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। বাংলা ভাষার উন্নয়ন হয়নি। একসময় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল জোর করেই যে, ইংরেজিই পড়ানো হবে না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় ১০০ নাম্বারের একটা মাত্র ইংরেজি কোর্স পড়ানো হত। আর সব কিছুই বাংলায় পড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মেম্বার ছিলাম। বাংলা ভাষার উন্নয়নে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হয় নাই। যেমন ধর উচ্চ শিক্ষা, উচ্চ আদালত এইসব ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার হয় না। এর কারণ হল, এখানে যে বই পত্র সেগুলো বাংলায় অনুবাদ করতে হবে। সে উদ্যোগ কারও নাই। উচ্চ শিক্ষার জন্য তোমাকে অবশ্যই ইংরেজি শিখতেই হবে।
অবসরঃ স্যার আমরা অবশ্যই ইংরেজি শিখবো। কিন্তু বাংলাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে তারপর শিখব।
আব্দুল আজিজঃ প্রশ্ন হল আমরা ইংরেজির বিরুদ্ধে না। ইংল্যান্ডে ইংরেজির সাথে সাথে ফ্রেঞ্চ, জার্মান এইসব ভাষা শিখতে হয়। এখন সমস্যা হল আমাদের ভাল কোন টার্মিনোলজি নেই। যেমন পদার্থের ইলাস্টিসিটি বা স্থিতিস্থাপকতা আর ইকোনমিক্সের ইলাস্টিসিটির মাঝে পার্থক্য আছে। তবে এখানেও সমাধান আছে। যেমন কেউ যদি বাংলায় পদার্থ কিংবা ইকোনমিক্সের ইলাস্টিসিটি লেখে তারপর ব্রাকেটে তার যথাযথ ইংরেজি টার্ম লিখে ফেলে তাহলে সমস্যা এড়ানো যায়। কমনলি এক্সেপ্টেড টার্মিনোলজি তৈরি হয়নি এখনওআর এই উদ্যোগ যে কেউ নেবে এমন কিছু চোখে পড়েনি। আসলে স্বাধীনতার পর যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে তারা কেউই দেশের শিল্প সংস্কৃতি শিক্ষা এইসব বিষয়ে উদ্যোগী ছিল না। আমাদের একটা শিক্ষানীতি পর্যন্ত ছিল না। যদিও শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত থাকাকালীন ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে শিক্ষা নীতি প্রণীত হয়েছিল কিন্তু পরে অন্য সরকার এসে এটা কার্যকর করেনি। তা না হলে আমাদের এই সমস্যাগুলো হয়ত থাকত না।
অবসরঃ স্যার আপনি কি মনে করেন ভবিষ্যতে এটা হতে পারে?
আব্দুল আজিজঃ হ্যাঁ অবশ্যই হবে। হতেই হবে।
অবসরঃ বাংলা ভাষা বিস্তার এবং প্রসারে বাংলা একাডেমীর কার্যক্রম কি যথাযথ মনে করেন? বাংলা একাডেমী এই ক্ষেত্রে আরও কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে?
আব্দুল আজিজঃ তারা প্রথম কিছু উদ্যোগ নেয়। যেমন বাংলা কিছু টেক্সট বুক করেছিল কিন্তু এগুলো পর্যাপ্ত না। এইগুলো আমাদের দেশে কতটুকু কাজে লাগবে সেই চিন্তা তারা করে নাই। বাংলা একাডেমীকে আরও সক্রিয় হতে হবে। বাংলা ভাষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে গেলে যা যা দরকার সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
অবসরঃ বাংলা একাডেমী গত দু’বছর ধরে আন্তর্জাতিক হে উৎসব পালন করে আসছেবাংলা ভাষার ক্ষেত্রে এই উৎসবের প্রভাব কি হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
আব্দুল আজিজঃ আমি পত্রিকায় এই সম্পর্কে পড়েছি কিন্তু আমি ঠিক এই বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।
অবসরঃ স্যার, সিলেটে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের ঘটনা বলুন।
আব্দুল আজিজঃ আমি তো সে সময় সিলেটের বাইরে ছিলাম। ১৯৭২ সালে কোর্টের সামনে একটা শহীদ মিনার তৈরি করা হয়। সেবার ২১ তারিখের অনুষ্ঠান চলছিল আর সেখানে কুদরত উল্লাহ মসজিদে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের মাইক তখন বন্ধ করা হয়নি। যে কারণে নামাজ শেষে মুসল্লিরা এসে শহীদ মিনার, হারমোনিয়াম এইসব ভেঙ্গে ফেলে। এরপরে পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি যে মালনিছড়ার ঐদিকে একটা শহীদ মিনার করা হয়েছিল। এরপর সম্ভবত সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার করা হয়। এই সম্পর্কে আমার স্পষ্ট ধারণা নেই কারণ আমি তখন সিলেটে ছিলাম না।
অবসরঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জেলে থাকাকালীন সময় বাংলা ভাষার দাবীতে অনশন করেছিলেন। এরপর তাঁকে ঢাকা থেকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়।
আব্দুল আজিজঃ তিনি তখন জেলে ছিলেনউনার সাথে কারো প্রত্যক্ষ কোন যোগাযোগ ছিল না। উনি তখন অনশন করেছিলেন রাজবন্দীদের মুক্তি চেয়ে। তবে এখন বলা হয় জেল থেকে উনি না কি খবরা খবর নিতেন, নির্দেশনা দিতেন। বলা হয় বলছি এ কারণে যে, তখন আমরা পত্রিকায় এই রকম কোন নিউজ পড়ি নাই। উনাকে নিয়ে কিছু বই লেখা হয়েছে। সেসব পড়লে হয়তো জানা যাবে সেসময় তিনি কি কি করছেন। তবে ১৯৪৮ সালে উনার বড় ভূমিকা ছিল। ১১ মার্চ তারিখে ভাষা দিবস পালন করা হত। সেদিন আন্দোলন হয়, সচিবালয় ঘেরাও করা হয়। এবং এই সময়ই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তখন থেকে তিনি জেলে ছিলেন।
অবসরঃ ১৯৫২ সালের পর ৫৪’র নির্বাচন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণ অভ্যুত্থান, ৭০’র সাধারণ নির্বাচন, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধীদের যথাযথ শাস্তির দাবীতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ- এই যে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, এই সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।
আব্দুল আজিজঃ ৫৪ সালের নির্বাচন বহুল ভাবে প্রভাবিত হয়েছে ৫২ সালের আন্দোলন দ্বারা। কারণ যুক্তফ্রন্টের যারা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন তারা সকলেই ছিলেন ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সৈনিক। এরপর ৫৬ সালে বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ৫৬ সালেই পাকিস্তানের জন্য সংবিধান রচিত হয়। আর এখানেই প্রথম চিঠি দেয়া হয় বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের জন্য। কিন্তু এটা বাস্তবায়িত হতে পারে নাই কারণ ৫৮ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে নেন। এরপর তো শহীদ মিনার নির্মাণ হয়। বিভিন্ন কারণে সেটা তার নকশা অনুযায়ী নির্মিত হতে পারেনি। তোমরা রফিকুল ইসলামের নাম জান কি না…
অবসরঃ জ্বী স্যার। উনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস’র সম্মানীত উপাচার্য। ৫২ সালের আন্দোলনের ছবি তিনি তুলেছিলেন।
আব্দুল আজিজঃ হ্যাঁ। আমরা ৫২ সালের যেসব ছবি দেখি সেসব উনারই তোলা। তো ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে যে আন্দোলন সেটার ক্ষেত্রে বলা যায় আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। কাদের মোল্লার ফাঁসির পর এইটা উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে। এবং এটা উজ্জীবিত যারা করেছেন তারাই গণজাগরণের কর্মী। এইটা শুভ লক্ষণ। এই চাপটা যদি রাখা যায় তাহলে সরকার এই বিচার কাজ করতে কিছুটা বাধ্য হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো আসলে একুশেরই চেতনা। এই চেতনাকে ধারণ করেই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এরপর বিভিন্ন সরকার তাদের সুবিধার্থে মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করেছে। জেনারেল জিয়া থেকে এরশাদ একইভাবে চলেছে। আমরা গণতান্ত্রিক ধারা পেলাম ১৯৯১ সালে। যদিও এটাকে পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ধারা বলা যায় না। আমাদের দেশে এখনও পুরোপুরি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যারা রাজনীতি করেন তাদের নিজেদের মধ্যেই গণতন্ত্রের চর্চা নাই। যেটা আমি নিজেই চর্চা করি না সেটা আমি প্রতিষ্ঠা করব কি করে! মহাত্মা গান্ধীর একটা কথা ছিল, আপনি আচরি ধর্ম, পরেরে শেখাও

অবসরঃ স্যার আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদেরকে এতটা সময় দেয়ার জন্য।
আব্দুল আজিজঃ ধন্যবাদ।

Post a Comment

Learn a good lesson thanks for share it

Thank you very much

কমরেড আসাদ্দর আলী বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম।তিনি সারাজীবন মেহনতী মানুষের কল্যানে কাজ করে গেছেন।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবিস্মরণীয় অবদান ছিল।তিনি কমিনিষ্ট আন্দোলনের পথিকৃত এবং বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের সাবেক সভাপতি ছিলেন।গণ মানুষের নেতা কমরেড আসাদ্দর আলীর স্বরনে একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মাত্র।সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।